ব্ল্যাক হোলের খপ্পরের সময়

মানিক রতন দুই বন্ধু। পনের বছর পর দুই জনের দেখা। পনের বছর বয়সেই শেষ দেখা হয়েছিল
দুই জনের। গণিত অলিম্পিয়াড এ ভালো ফলাফল করে মানিক যুক্তরাষ্ট্রে র এমআইটিতে
( ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজি) তে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়। ওখান থেকে শিক্ষা শেষ করে যুক্ত
হয়ে যান নাসার সাথে।সেই সুবাদে ও কিছু দিন কাটিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক মহা কাশ স্টেশনে।এখন দেশে এসেছে।
থাকবে কিছু দিন।এক দিন আলাপ হচ্ছে দুই জনের।
রতন: আচ্ছা শুনেছি ব্ল্যাক হোলে নাকি সময় থেমে যায়।আর আন্তর্জাতিক স্টেশনে ও নাকি সময় আলাদা গতিতে চলে।
এগুলো কি সত্য?
মানিক: হ্যা্, মহাকাশ স্টেশনে সময় আমাদের চেয়ে দ্রুত চলে। তবে ব্ল্যাক হোলের সময় থেমে যাওয়া র কতাটা ব্যাক্যা সাপেক্ষ।
রতন: কী রকম? একটু বলবে?
মানিক: সেটা বুজতে হলে আগে কিছু বিষয় জানা দরকার।ভিন্ন পর্যবেক্ষক কের তুলনায় সময় ধীরে চললে,তাকে কাল
দীর্গায়ন।কাল দীর্ঘায়ন ঘটতে পারে দুই ভাবে। কেউ যদি অনেক বেশি বেগ(আলোর বেগের কাছাকাছি) নিয়ে চলাচল করে,
তবে স্থির কোনো দর্শকের তুলনায় তার সময় ধীরে চলবে।আবার কেউ যদি কোনো মহাকর্ষের উৎসের খুব নিকটে থাকে,
তবে তারও সময় ধীরে চলবে।প্রথমটি হলো বিশেষ আপেক্ষিক তত্তের ফলাফল। ১৯০৫ সালে এটি প্রকাশ করে ই বিখ্যাত হন আইনস্টাইন। ১৮১৫ সালে প্রকাশ করেন আরও যুগান্তকারী তত্ত্ব। এটাই বর্তমান পদার্থ বিদ্যার অন্যাতম স্তম্ভ। নাম সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। এখান থেকেই আসে মহাকর্ষ জনিত কাল দীর্গায় নের ধারনা।
রতন :তাহলে মহাকাশ স্টেশনে তো একই সাথে দুটোই হচ্ছে,তাই না? কারণ এটি একই সাথে পৃথিবীর মহাকর্ষ কেন্দ্র থেকে দূরে আবস্থান করছে।আবার চলছে বেগ নিয়েও।
মানিক: হ্যাঁ, হচ্ছে। তবে দুটোর প্রভাব বিপরীত ভাবে কাজ করে।মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে খুব বেশি উঁচুতে নেই।
এর গড় উচ্চতা হলো ২৩০ মাইল।সর্বোচ্ছ ২৫৫ মাইলের একটু উপরে থাকে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরে থাকায় তুলনামূলক ভাবে আমাদের সময় ধীরে চলছে।এটি আবার প্রতি সেকেন্ড ৪ দশমিক ৭৭ মাইল বেগে ঘুরছে।ফলে বেগের কারণে আমাদের তুলনায় এর সময় ধীরে চলছে।মহাকাশ স্টেশনের উচ্চতা খুব বেশি নয় বলে এক্ষেত্রে বেগের প্রবাব বেশি।
দুটোর মিলিত হিসাবে তাই মহাকাশ স্টেশনের সময় ধীরে চলছে প্রতি ছয় মাসে ০.০০৫ সেকেন্ড।
রতন: এত ছোট হিসাব নিকাশ করে লাব কী?
মানিক: মহাকাশ স্টেশনে সময় কত ধীরে চলছে, সেটা তুলনামূলক কম গুরুত্ব পূর্ণ। কিন্তুু তুমি আচেনা জায়গা খুজতে পেতে নিশ্চয় অনেক সময় জিপিএস ব্যবহার কর?আবস্থান বের করার জন্য এখন পর্যন্ত ৭২ টি জিপিএস উপগ্রহ পাঠানো হয়েছে।কিন্তুু এগুলোর সব কয়টি এখন কাজে লাগচে না বর্তমানে কাজ করচে মাত্র ২৪ টির মতো উপগ্রহ।
যাই হোক এরা সাধারণত ভূমি থেকে ২০ হাজার কৃমি উচ্চতায় ঘুরে। এ কারণে ভূমির ঘড়ির তুলনায় উপগ্রহ এর ঘড়ি প্রতি দিন ৪৫ মাইক্রো সেকেন্ড এগিয়ে আগে ঘুরে এগিয়ে যায়।আবার এদের বেগ ঘন্টায় প্রায় ১৪ হাজার কিমি।এ কারণে এদের ঘড়ি প্রতি দিন ৭ মাইক্রো সেকেন্ড পিছনে পড়ে যায়।ফলে দুইটি কাটাকাটি করলে আমাদের তুলানয় উপগ্রহ এর ঘড়ি প্রতি দিন ৩৮ মাইক্রো সেকেন্ড এগিয়ে যায়।এ জন্য জিপিএস স্যাটেলাইট দিয়ে দিয়ে আবস্থান জানতে হলে ঠিক ভাবে এটা সংশোধন করে নিতে হয়।আর না করলে আমরা আবস্থান বের করতে গিয়ে কয়েক মাইল পর্যন্ত ভুল আবস্থান পেতাম।
রতন: কিন্তুু মহাকর্ষ কিভাবে কাল দীর্ঘায়ন ঘটায়? ব্যাপার টা মাথায় ঢুকতেছেনা।
মানিক: ব্যাপার টা খুবই সোজা। এটা বোঝানোর জন্য মনে রাখতে হবে ত্বরণ ( সময়ের সাথে বেগের পরিবর্তন)আর মহাকর্ষ আসলে একই রকম জিনিস।এদের পার্থক্য করা সম্বভ নয়।

এর নাম সম তূল্যতার নীডি (Equivalence Principle)

রতন:কীভাবে একই তা তো বুজলাম না?
মানিক: একটা উদাহরণ দিয় তাহলে।ধরো, তুমি মহাশূন্য র মধ্য স্থাপিত একটি লিফটে আছো যেখানে মহাকর্ষ অনুপস্থিত। ফলে এখানে ওপরে বা বা নিচ বলতে কিছু ই নেই।তুমি ভেসে আছো মুক্ত ভাবে।একটু পর লিফট খানা সমত্বরণে চলা শুরু করল।এখন হঠাৎ করে তুমি ওজোন অনুভব করবে।লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটা টান অনুভব করবে তুমি।এখন এই দিক টিকেই তোমার কাছে মেঝে বলে মনে হবে! এখন মেঝের দিকে আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে।আসলে এখন তেমার মতোই লিফটের ভিতরে র সব গুলো ত্বরণ বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে লিফটা আসলে গতীশীল নয়,বরণ এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থির আবস্থায় আছে।
আইনস্টাইন এভাবে ই বুজাতে পারে ছিলেন, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন বসে যেমন কেউ বলতে পারবে না যে সে আসলেই চলছে কিনা,তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও সে বুঝতে পারবে না আসলে সে সুষম ত্বরণে চলছে, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে র মধ্য আছে।আইনস্টাইন এই চিন্তার ফলাফল ই হল সমতুল্যতার নীতি।
রতন:কে বলেচে? আমরা ট্রেনে বসে বেগ টের পায় না?
মানিক:আমরা বাসে বা ট্রেনে বেগ টের পাই আসলে ঝাঁকুনির কারণে।যদি মসৃণ রাস্তায় গাড়ি চালানো হয়,আর জানালা বন্ধ করে রেখে গাড়ির গতির কারণে বাইরের দৃশ্য পটের পরিবর্তন নজর থেকে সরিয়ে রাখা হয়,তাহলে বেগ বোজার কোন উপায় থাকবে না।
রতন: ও আচ্ছা বুঝলাম। বেগের মতোই মহাকর্ষ আর ত্বরণের পার্থক্য বোঝা যাবে না
কিন্তুু কাল দীর্ঘায়ন কিভাবে হয় তা তো বুজলাম না।
মানিক: বলছি।মহাশূন্য অবস্থিত একটি রকেটের কথা কল্পনা করো।চিন্তার সুবিধার জন্য ধরে দাও রকেট টি এত বড় যে এর শীর্ষে থেকে তলায় আলো পৌঁছাতে এক সেকেন্ড সময় লাগে।অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১,৮৬,০০মাইল।আরও মনে করো,রকেটের সিলিং ও মেজেতে একজন করে দর্শক আছেন। দু জনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে,যা প্রতি সেকেন্ড একটি করে ঠিক দেয়।
এখন সিলিং টর দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছে ন।টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সংকেত পাঠালেন।পরে ঘড়িটি আবারও টিক (সেকেন্ড কাঁটায়) দিলে তিনি আরেক টি সংকেত পাঠালেন।এ অবস্থায় প্রতিটি সংকেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পোঁছায়। সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ড ব্যাবধানে সংকেত দুটি পাবেন।
মহাশূন্য মুক্ত ভাবে ভেসে না চলে রকেট খানা যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্য থাকত তাহলে কী ঘটত? নিউটনীয় থিওরি অনুসার এই ঘটনায় মহা কর্ষের কোনো হাত নেই।সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড র ব্যাবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক ও এক সেকেন্ড মধ্যই তা পাবেন।কিন্তু সমতুল্য তার নীতি ভিন্ন কথা বলে।
রতন: কিন্তুু কিভাবে?
মানিক:আচ্ছা ধরো, স্থির থাকার বদলে রকেটটি ত্বরণ নিয়ে উুপরের দিকে চলেছে।অর্থাৎ প্রতি মুহুর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথমে সঙ্কেত টিকে আগের চেয়ে( যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে।কাজেই সঙ্কেত টি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই তলায় পৌঁছে যাবে।রকেটটি যদি নিদিষ্ট বেগে ত্বরণ হীন চলত তাহলে আগে পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাত। কারণ সেক্ষেত্র এক সেকেন্ড সময় পর সিলিং যত টুকু ওপরে উঠবে, মেঝে কও তত খানি ওপরে উঠতে হবে।

কিন্তুু এখানে ত্বরণ আছে বলে প্রথমে যখন সংকেট পাঠানো হয়েছিল, রকেট তার চেয়ে দ্রুত চলছে। কাজেই দ্বিতীয় সংকেত কে আরও কম দূরত্ব পার হতে হবে।ফলে এটি পৌঁছাতে ও আরো কম সময় লাগবে।কাজেই মেঝের দর্শক দুই সংকেত মাঝে সময় ব্যবধান পাবেন এক সেকেন্ড এর চেয়ে কম।অথচ সিলিং এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে।হয়ে গেল সময়ের গরমিল।

ত্বরণ প্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমন টি ঘটে নিশ্চয় অদ্ভুত লাগছে না।কিন্তুু মাথায় রাখতে হবে, সমতুল্যতা র নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে ও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণ প্রাপ্ত নাও হয় (যেমন ধরো এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপ ণের জন্য বসিয়ে রাখা আছে) তাহলে সিলিং এর দর্শকও এক সেকেন্ড পর দুটো সংকেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ড এর কম সময়ের মধে্যই। এবার অদ্ভুত লাগছে তাই না! কিন্তুু বুঝে ফেললে এটা কেই স্বাভাবিক মনে হওয়া উচিৎ।

রতন: বুঝেছি মোটামুটি। কিন্তুু বিশাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

মানিক : তবুও এটা সত্য। ১৯৬২ সালে এই অনুমানের পরিক্ষা নেওয়া হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ার রের ওপরে ও নিচে দুটি অতি সুক্ষ ঘড়ি বাসানো হয়।দেখা গেল নিচের ঘড়ি টিকে ( যেটি পৃথিবীর পৃষ্টের খুব কাছে আছে) সনয় খুব ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমন টি অনুমান করেছিল তেমন ই। এই প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোন ঘড়ি ও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য বোঝাবে।
কিন্তু পৃথিবীর ওপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সমশের এই ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমান বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করে।সেটা ত আগেই বললাম। তবে একটা বিষয় মনে রাখবে।
প্রতেকের কাছে কিন্তুু নিজের সময় কে স্বাভাবিক মনে হবে।অনে্্য সময় জোরে বা আস্তে প্রবাহিত হচ্ছে বলে মনে হবে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *